করোনায় শিশুদের নতুন জটিলতা এমআইএস-সি – DesheBideshe


গত ২ অক্টোবর করোনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জটিল ও নতুন অসুস্থতা মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেটরি সিন্ড্রোম ইন চিলড্রেন-এ (এমআইএস-সি) আক্রান্ত হয়ে মারা যায় নটরডেম কলেজের এক শিক্ষার্থী। স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকা ১৭ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থীর এমআইএস-সিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের আইসিইউ জেনারেল ইউনিটের কনসালটেন্ট রায়হান রাব্বানী।

ঢাকা শিশু হাসপাতালে এমআইএস-সিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও দুই শিশু। তাদের মধ্যে সাত বছরের এক শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হয়। কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াতে ডায়ালাইসিস শুরু হয়, অস্ত্রোপচারেরও প্রয়োজন ছিল। শিশুটির প্রথম দুইবারের করোনার ফলাফল ছিল নেগেটিভ, তৃতীয়বার রিপোর্ট পজিটিভ আসার পর তার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। তখন নানান পরীক্ষাতে ধরা পড়ে শিশুটি এমআইএস-সিতে আক্রান্ত।

অপর শিশুটি নয় বছরের। একই হাসপাতালেই ভর্তি ছিল এমআইএস-সি নিয়ে। কিন্তু শিশুটির পরিবার চিকিৎসা না চালিয়ে হাসপাতাল থেকে চলে যায়, পরে শিশুটি মারা যায়।

বর্তমানে ওই হাসপাতালে ভর্তি থাকা দুই শিশুর একজনের বয়স ১৭ দিন, আরেকজনের বয়স দেড় বছর।

করোনা মহামারির শুরুতে আক্রান্তদের মধ্যে বৃদ্ধ এবং অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তরা ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানানো হয়। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তবে এবারে করোনার সঙ্গে শিশুদের নতুন জটিল ও বিরল রোগ মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেটরি সিন্ড্রোম (এমআইএস-সি) ভাবিয়ে তুলেছে চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের।

আরও পড়ুন: বিশ্বে করোনা আক্রান্ত ছাড়াল ৪ কোটি ২৯ লাখ

চিকিৎসকরা বলছেন, ‘শিশুদের ‘এমআইএস-সি’- পেডিয়াট্রিক মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেটরি সিন্ড্রোম একটি বিরল রোগ ও জটিল রোগ, যার কোভিড-১৯ এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।’

এখন হাসপাতালগুলোতে রেগুলার এমআইএস-সি’র রোগী পাচ্ছেন বলেও জানান তারা। যদি দ্রুত চিকিৎসা শুরু না করা যায়, তাহলে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে, বলছেন তারা।

চিকিৎসকরা বলছেন, এমআইএস-সি নতুন এক রোগ, যেটা কোভিড-১৯ এর ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। সারা শরীরে র‌্যাশ অথবা গায়ে লাল দাগ, অস্বাভাবিক অবসাদ বা দুর্বলতা, উচ্চমাত্রার জ্বর, গাল-ঠোঁট ফাটা, চোখ-জিভ লাল (স্ট্রবেরি টাং) হয়ে যাওয়া, বমি-ডায়রিয়া, পেট-মাথা ব্যথা, হাত-পা ফুলে যাওয়া, অজ্ঞান হওয়া, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, অক্সিজেন লেভেল কমে যাওয়া, শরীরের রঙ বদলে নীলচে হয়ে যাওয়া, চামড়া উঠে যাওয়া এবং শ্বাসকষ্ট হচ্ছে এর লক্ষণ ও উপসর্গ।

তারা বলছেন, শিশুদের মধ্যে এই রোগটি বেশি দেখা গেলেও, অল্প বয়স্ক তরুণরাও এতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রধানত, জন্মের পর থেকে ২১ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোররা এতে আক্রান্ত হতে পারে। কোভিড-১৯-এর সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার সম্ভাবনার জন্য কোভিড-১৯ দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তিদের কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের এতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকতে পারে। তবে, এমআইএস-সি রোগীদের দেহে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটির উপস্থিতি বা কোভিড-১৯ ডায়াগনসিস করার জন্য কোনও উপসর্গ থাকবে, তা জরুরি নয়।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে শিশু মারা গেছে ৪৫ জন, যা মোট মৃত্যুর শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ। আর শূন্য থেকে ১০ বছরের মধ্যে মারা গেছে ২৯ জন। যা কিনা মোট মৃত্যুর শতকরা হিসাবে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ।

বিশ্বে এমআইএস-সি প্রথম ডায়াগনসিস হয় যুক্তরাজ্যে গত ২৬ এপ্রিল, পরে একে একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতেও এটি দেখা যায়। বাংলাদেশে এ রোগী প্রথম শনাক্ত হয় গত ১৫ মে বেসরকারি এভারকেয়ার হাপসাতালে। দ্বিতীয় রোগী ২৭ মে, তারপর থেকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রথম আসা এদের একজনের বয়স ছিল তিন মাস, আরেকটি শিশুর বয়স ছিল দুই বছর দুই মাস। দুটি শিশুরই পাঁচ থেকে সাত দিন ধরে জ্বর ছিল ১০২ ডিগ্রি থেকে ১০৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায়।

দুই বছর বয়সী শিশুটির খিঁচুনির সঙ্গে ছিল হার্ট বড় হয়ে যাওয়া ও হার্টের কার্যক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার সমস্যা। সঙ্গে ছিল হাতে পায়ে লালচে দানা, চোখ-ঠোঁট লাল, বমি এবং ডায়রিয়া। এই শিশুটির কিছু অতিরিক্ত লক্ষণ ছিল, যেটা এমআইএস-সির মূল লক্ষণ। শিশুটি শকে চলে যাচ্ছিল দ্রুত, তার আইসিইউ সাপোর্ট দরকার হয়। এই শিশুটির কোভিড-১৯ পজিটিভ ছিল, কিন্তু অন্য শিশুটির ফলাফল নেগেটিভ এলেও কিছুদিন পরই তার পরিবারের সব সদস্যের করোনা শনাক্ত হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের দ্য সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) জানিয়েছে, কোভিড-১৯ ও এমআইএস-সি একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত।

সংস্থাটি জানিয়েছে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত বা আক্রান্ত অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা বা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিল, এমন শিশু-কিশোরদের মধ্যে এমআইএস-সি দেখা যাচ্ছে। এমনকি কারও কারও সঙ্গে করোনার কোনও লক্ষণও ছিল না, তবু শিশুদের মধ্যে এই ভাইরাসটি সক্রিয় থাকতে পারে এবং একই সঙ্গে তার মধ্যে এমআইএস-সির লক্ষণগুলোও দেখা যেতে পারে। কোভিডে আক্রান্ত না হয়েও কোভিড-আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে এসে ২১ বছরের কম বয়সীরা এই জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে, বলছে সিডিসি।

গত ১৫ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এমআইএস-সি সম্পর্কে জানায়। গত ২২ মে জনস হপকিন্সের এক নিবন্ধে এমআইএস-সিকে বিরল বলা হয়েছে।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার কম বলে মনে হলেও, শিশুদের মাঝে কোভিড-১৯ সংক্রমণ একবারে কম নয়।

তিনি বলেন, একইসঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কোভিড-১৯ সংক্রমিত শিশুদের মধ্যে মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লামেশন সিন্ড্রোম নামের এক জটিল অসুখের খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা আশঙ্কাজনক এবং তা শিশুমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

করোনার মৃদু সংক্রমণের কারণেও দেহের বিভিন্ন অঙ্গ দীর্ঘস্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা শিশুদের জন্যও প্রযোজ্য, যোগ করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

করোনায় শিশুদের নতুন জটিলতা এমআইএস-সি

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ক্রিটিক‌্যাল কেয়ার নেফ্রোলজি অ্যান্ড ডায়ালাইসিস বিভাগের অধ্যাপক ডা. শিরীন আফরোজ জানান, শিশু হাসপাতালে তার ইউনিটেই ১০টি শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে দু’জন মারা গেছে, ছয় জনকে রিলিজ দিয়েছেন আর দুই শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চিকিৎসাধীন দুই শিশুর মধ্যে একজনের বয়স ১৭ দিন, অপর শিশুর বয়স দেড় বছর। ১০ শিশুর মধ্যে একজনের কোভিড-পজিটিভ ছিল, বাকিদের কোভিড নেগেটিভ। আবার এদের মধ্যে ছয় জনের কোভিড কন্টাক্টের হিস্ট্রি আছে, বাকিদের সেটাও নেই।

‘এমআইএস-সি’ একটি বিরল রোগ, যেটি কোভিড-১৯ এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটা কোভিড হবার তিন থেকে চার সপ্তাহ পরে প্রকাশ পায়। তাই তখন পরীক্ষা করালে নেগেটিভ হবার সম্ভাবনাই বেশি। আর সেজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সিডিসি বলছে, করোনা কনফার্ম করার জন্য অ্যান্টিবডি টেস্ট করতে। কিন্তু অ্যান্টিবডি টেস্ট অ্যালাউ না করাতে, সেটি আমরা করতে পারছি না। অথচ মিড আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত এই রোগী আমরা রেগুলার পাচ্ছি।

অধ্যাপক শিরীন আফরোজ বলেন, শিশুদের যদি উচ্চমাত্রায় জ্বর থাকে, তাহলে তিন থেকে চার দিনেই অভিভাবকদের সতর্ক হতে হবে। চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে, দেরি করলেই বিপদ হতে পারে।

এভারকেয়ার হাসপাতালের শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তাহেরা নাজরিন বলেন, হার্ট, কিডনি, ফুসফুস ও যকৃতের মতো একাধিক অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমআইএস-সি। সেই সঙ্গে রক্তনালির প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং তা হয় অসম্ভব দ্রুত গতিতে। এর বৈশিষ্ট্যগুলো অনেকটা কাওয়াসাকি ডিজিজ ও টক্সিক শক সিনড্রোমের মতো।

এ হাসপাতালে প্রায় ৩৫টির মতো শিশু এই রোগে চিকিৎসাধীন ছিল বলেও জানান তিনি। বর্তমানে ভর্তি আছে ১২ বছরের এক শিশু। এই শিশুদের মধ্যে মাত্র পাঁচ শিশুর করোনা পজিটিভ ছিল, বাকিরা করোনা আক্রান্তদের ক্লোজ কন্টাক্টে ছিল, যোগ করেন তিনি।

হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ১৫ শিশুকে নিয়ে করা অপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে শিশুরা সাত দিনের মধ্যে চিকিৎসা নিতে এসেছে, তারা কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর যারা সময়মতো আসেনি, তাদের করোনারি আর্টারি ফুলে থাকে অনেকদিন পর্যন্ত। এটাও জার্নাল অব কার্ডিওলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে, আগের অবস্থায় ফিরতে তাদের বছরও লাগতে পারে বলে জানান ডা. তাহেরা নাজরিন।

এন এইচ, ২৫ অক্টোবর





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *